দেশে ভোজ্যতেলের সরবরাহ কমিয়ে দাম বাড়ানোর অভিযোগ ছিল মিল মালিকদের বিরুদ্ধে। এরপর সরকার দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিলে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে মূল্যবৃদ্ধির এক মাসের ব্যবধানে ফের সরবরাহ সংকট দেখিয়ে সয়াবিন তেলের দাম বাড়ানোর চেষ্টা করছে ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানগুলো। এক মাসের ব্যবধানে এরই মধ্যে পাইকারিতে মণপ্রতি (৩৭ দশমিক ৩২ কেজি) ৩০০-৩৫০ টাকা বেড়েছে। সে হিসাবে কেজিতে দাম বেড়েছে প্রায় ১০ টাকা।
ভোগ্যপণ্যের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকারি পর্যায়ে মূল্যবৃদ্ধির অনুমোদনের পর সয়াবিন তেলের পাইকারি দাম মণপ্রতি কমে ৬ হাজার ২৫০ টাকায় নেমে যায়। তবে এক সপ্তাহ ধরে তা আবার বেড়ে ৬ হাজার ৫৫০ থেকে ৬ হাজার ৬০০ টাকায় গিয়ে উঠেছে। মিলগেট থেকে সরবরাহ কমিয়ে দেয়ার কারণে পাইকারি বাজারে নিত্য এ পণ্যের দাম বাড়ছে বলে অভিযোগ সাধারণ ব্যবসায়ীদের।
দেশের বাজারে দাম বাড়লেও বিশ্ববাজারে সাম্প্রতিক সময়ে নিম্নমুখী সয়াবিন তেলের দাম। সর্বশেষ গত ডিসেম্বরে বৈশ্বিক বুকিং দর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কমেছে। গত মাসে কেনা অপরিশোধিত সয়াবিন তেল জানুয়ারির শেষার্ধে দেশে পৌঁছবে। কিন্তু পাইকারি বাজারে মিলগেট থেকে সরবরাহ কমিয়ে দেয়ার পাশাপাশি ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানগুলো বাজার থেকে বিক্রি হওয়া এসও (সরবরাহ আদেশ) বাই-ব্যাক করায় বাজার দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে বলে পাইকারি ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন।
জানুয়ারিতে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের পিঙ্ক শিট প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত অক্টোবরে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের বুকিং দর ছিল ১ হাজার ৯৫ ডলার। নভেম্বরে ৫০ ডলার বেড়ে লেনদেন হয়েছে গড়ে ১ হাজার ১৪৫ ডলারে। যদিও সর্বশেষ ডিসেম্বরজুড়ে সয়াবিন তেলের বুকিং দর ছিল ১ হাজার ৬৪ ডলার। এক মাসের ব্যবধানে ৮১ ডলার কমলেও মিল মালিকরা বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ফের বাড়ানোর চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ সাধারণ ব্যবসায়ীদের। ফলে পণ্যটির দাম প্রায় প্রতিদিনই বাড়ছে বলে জানিয়েছেন তারা।
খাতসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ভোজ্যতেলের দাম স্থিতিশীল রাখতে সরকার নানাভাবে চেষ্টা করছে। আমদানিকারকরা দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করলে সরকার দুই দফায় শুল্ক কমায়। এর পরও বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত ভোজ্যতেলের দাম বেড়ে যাওয়াসহ ডলার সংকট ও বিনিময় মূল্য বৃদ্ধির কারণে বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম বাড়ায় সরকার। একইভাবে খোলা সয়াবিন তেল, খোলা পাম অয়েলের দামও বাড়ানোর প্রস্তাব অনুমোদন করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। মূলত মিলগেট থেকে আমদানিকারকরা সরবরাহ কমিয়ে বাজারে সরবরাহ সংকট তৈরির পর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় দাম বাড়াতে সম্মত হয়েছিল। বিশ্ববাজারে দাম না বাড়লেও বাজারে কৃত্রিম সংকটের মাধ্যমে এবারো বাজারকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা হচ্ছে বলে সাধারণ ব্যবসায়ীদের দাবি।
জানা গেছে, ভোজ্যতেলের দাম কমাতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) গত অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে জারি করা এক আদেশে পরিশোধিত ও অপরিশোধিত সয়াবিন তেল কিংবা পাম অয়েল উৎপাদন ও ব্যবসায়িক পর্যায়ে প্রযোজ্য মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট ১৫ শতাংশ মওকুফ করে। বাজারে ভোজ্যতেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে পরিশোধিত ও অপরিশোধিত সয়াবিন তেল ও পাম অয়েলের ওপর আরোপিত মূল্য সংযোজন করও ছাড় দেয়া হয় ওই আদেশে। আরেক আদেশে পরিশোধিত ও অপরিশোধিত সয়াবিন তেল কিংবা পাম অয়েল আমদানির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ভ্যাট ১৫ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়। পৃথক দুটি আদেশের পরও পাইকারি বাজারে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ে লিটারপ্রতি অন্তত ১০-১৫ টাকা। দুই দফায় শুল্ক কমানোর পরও বাজারে দাম না কমায় লোকসান এড়াতে খোলাবাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেল সরবরাহ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।
এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ৯ ডিসেম্বর বৈঠকের পর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় মিল মালিকদের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে ভোজ্যতেলের নতুন দাম অনুমোদন দেয়। নতুন দাম অনুযায়ী বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি ৮ টাকা বাড়িয়ে ১৬৭ থেকে ১৭৫ টাকা, প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন তেলের দাম ১৪৯ থেকে বাড়িয়ে ১৫৭ এবং খোলা পাম অয়েলের লিটারও ১৪৯ থেকে বাড়িয়ে ১৫৭ টাকা করা হয়। এছাড়া বোতলজাত পাঁচ লিটার সয়াবিন তেলের দাম ৮১৮ থেকে বাড়িয়ে ৮৬০ টাকা করা হয় তখন।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ পাইকারি ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. গোলাম মাওলা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকার দুই দফায় ভোজ্যতেলের ওপর শুল্ক কমিয়েছে। এরপর ব্যবসায়ীদের দাবির মুখে দামও বাড়িয়ে দেয়া হয়। এখন ফের দাম বাড়ছে।’ এক্ষেত্রে সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি আমদানিকারক পর্যায়ে মনিটরিং কার্যক্রম বাড়ালে ভোজ্যতেলের বাজার স্থিতিশীল থাকবে বলে মনে করছেন এ ব্যবসায়ী নেতা।